আমার হল থেকে আপার বাসায় যেতে পনেরো মিনিট লাগে। আপার বাসাতেই আমি তিনবেলা খাবার খাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস না থাকলে আপার বাসায় চলে যাই, রাতে শুধু হলে ঘুমাতে আসি। অবশ্য আপাদের বাসায় ঘুমানোর মতো জায়গা নেই। দুই রুমের একটা বাসা, এক রুমে আপা দুলাভাই থাকে। আরেক রুমে থাকে আপার দুই মেয়ে মোহনা আর রুমানা। মোহনা এবার ক্লাস টেনে পড়ে আর রুমানা নাইনে। দুপুরে গোসল করেই মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে আপার বাসায় আসি। রুমে একা ভালো লাগছে না, তাছাড়া আজকে কোনো ক্লাস নেই। মোহনার সাথে দাবা খেলা যাবে, মেয়েটা দাবা ভালো খেলে। অবশ্য আমার বড় দুলাভাইকে বলা যায় দাবার গুরু। তিনি এখন অফিসে আছেন নয়তো তার সাথে খেলা যেতো। শুক্রবার বিকালে দুলাভাই আর আমার দাবার আসর বসে, পাশে মোহনা আর রুমানা দাঁড়িয়ে থাকে। মোহনা থাকে আমার পক্ষে আর রুমানা তার বাবার পক্ষে। শুক্রবার বিকালের এই সময়টা আপাদের বাসায় বিশেষ আয়োজন হয়, আপা ভালো কিছু নাস্তা তৈরি করেন তখন। দরজায় টোকা দিলেই আপার ছোটো মেয়ে রুমানা দরজা খুলে দেয়। রুমানার মুখটা শুকনো লাগছে, জিজ্ঞেস করলাম রোজা আছে কিনা। রুমানা বলে, হ্যাঁ মামা রোজা আমি, ঠিক করেছি এবার সবকটা রাখবো। আমি ঘরের ভিতরে যেয়ে মোহনাকে ডাক দেই। মোহনার কোনো সাড়াশব্দ নেই। আপা রান্নাঘরে রান্না করছেন। আপার কাছে যেয়ে জিজ্ঞেস করি মোহনা কোথায়? আপা বলে, দেখ ওর রুমে হয়তো। দরজার কাছে যেয়ে টোকা দিয়ে মোহনাকে ডাক দিলাম। দুবার ডাকবার পরে মোহনা সাড়া দেয়। আমি বলি ভিতরে আসবো? মোহনা বলে, আসো মামা। ঘরের ভিতরে যেয়ে দেখি মোহনা টেবিলের উপর মাথা নিচু করে চেয়ারে বসে আছে। আমি মাথায় হাত রেখে বলি রোজায় বেশি খারাপ লাগছে? মোহনা মাথা নিচু রেখেই বলে, না মামা। আমি বাসায় এসেছি আর মোহনা চুপচাপ এভাবে ঘরের কোনায় বসে আছে এমন কখনো হয়নি। মোহনার মাথা টেবিলের উপর থেকে তুলি, মোহনা যলদি করে চোখ মুছে নেয়। দেখি টেবিল ভিজিয়ে ফেলেছে চোখের পানিতে। আমি বলি, কি হয়েছে আমার মায়ের? মোহনা অন্যদিকে তাকিয়ে বলে কিছু হয়নি মামা। কিছু একটা যে হয়েছে আমি বুঝতে পারি। আপা বকেছে? মোহনা বলে, না মা কিছু বলেনি। তাহলে রুমানার সাথে ঝগড়া হয়েছে? দুই বোনের প্রায়ই ঝগড়া হয়, তবে সেই ঝগড়া দীর্ঘসময় থাকে না। আবার ঠিক হয়ে যায়। মোহনা বলে, রুমানার সাথেও ঝগড়া হয়নি। মোহনা বলে, মামা একটা ফ্রিজ কতো করে? আমি বলি কেন ফ্রিজ নিয়ে কি হয়েছে? কিছু হয়নি। আজকে মা পাশের বাসায় ফ্রিজে আমাকে মাছ আর পানি রেখে আসতে বলেছে। তারা আমাদের পানির বোতল কিংবা মাছ কিছুই রাখেনি। আমি এবার বুঝতে পারি মোহনার কান্নার কারণ। মোহনা বলে, বাবাকে কতোবার বলেছি একটা ফ্রিজ কিনতে কিন্তু কিনে না। আমরা বারবার মানুষের কাছে অপমানিত হই। মোহনা অভিমানে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে। ইফতারের সময় ঠান্ডা পানির শরবত খেতেই পাশের বাসায় ফ্রিজে পানির বোতল রাখতে গেছিলো, তবে তারা ফিরিয়ে দিয়েছে তাই মোহনার মন এখন মন খারাপ। বাবার উপরও অভিমান করে আছে মেয়েটা। দুলাভাইর অবস্থা আমি বুঝি। ভাইয়া একটা কোম্পানিতে চাকরি করে, বেতন বেশ ভালোই পায়। তবে একটা লোন আছে সেখানে টাকা দেয়, সাথে দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ দিতে হয়। ঘরভাড়া দিতে হয়। সবকিছু এই একটা মানুষই সামলায়। তারপরও টানটানিতে চলে যায়, একসাথে অনেকগুলো টাকা দিয়ে ফ্রিজ কেনা সম্ভব না। আমি মোহনা রুমানাকে মাঝেমধ্যে দুই একটা পোশাক কিনে দিতে পারি। তাতেই ওরা অনেক খুশি হয়। মোহনার অভিমানী মুখ আর ভেজা চোখ দেখে খারাপ লাগে। আমার যদি টাকা থাকতো এখনই একটা ফ্রিজ নিয়ে আসতাম। মোহনাকে সাথে করে নিয়ে যেতাম, তারপর বলতাম পছন্দ মতো ফ্রিজ নিতে। তবে সেই ক্ষমতা আমার নেই। মোহনার মাথায় হাত রেখে বলি, দোকান থেকে আমিই বিকালে ঠান্ডা পানি কিনে নিয়ে আসবো, সেই পানিতে শরবত বানালে হবে না? মোহনা বলে, হবে মামা। ইফতারের কিছুসময় আগেই দোকান থেকে ফ্রিজের এক বোতল ঠান্ডা পানি কিনে নিয়ে আসি। মোহনা আর রুমানা মিলে শরবত বানায়। আপা অন্য কাজ করে। আজান দেবার পাঁচ মিনিট আগে দুলাভাই বাসায় আসে। একসাথে সবাই ইফতারি করতে বসে যাই। ইফতারি করেই আপার বাসা থেকে বের হই। আপা রাতে খাবার খেতে আসতে বলেছে, আপাকে বলেছি আপা রাতে আর আসবো না। সেহরি হোটেল থেকে নিয়ে হল যাবো। সন্ধ্যার পরে দুটো টিউশন আছে। আমি টিউশনে চলে যাই। প্রথমে আরমানদের বাসায় যাই, আরমানকে পড়িয়ে বের হই আটটায়। পাশেই একটা মসজিদে এশার নামাজ পড়ে নেই, ঠিক করি তারাবি পড়বো হলে যেয়ে। এশার নামাজ পড়ে চারুলতাদের বাসায় যাই। এই মেয়েটা এবার ইন্টারে পড়ে বিজ্ঞান বিভাগে। চারুলতাদের বাসায় পড়াতে গেলে, চারু বলে ভাইয়া আজকে পড়বো না। রোজা ছিলাম অনেক ক্লান্ত লাগছে। চারুর মা এসে বলে, আজকে যেহেতু পড়তে চায় না থাক পড়াতে হবে না, রোজা ছিলোতো এখন অনেক ক্লান্ত হয়ে গেছে। চারুদের বাসা থেকে বের হবো তখনই আন্টি বসতে বলে। আমি সোফার উপরে বসে। কিছুক্ষণ পরেই আন্টি কয়েকটা মিষ্টি আর ফল নিয়ে এসে সামনে দেয়। আন্টি আমার হাতে একটা ফোনের বাক্স দেয়। আমি বললাম এটা কিসের? আন্টি হেসে বলে, চারুকে তো তুমি অনেকদিন থেকে পড়াচ্ছো তেমন কিছু দেওয়া হয়নি; তোমার অংকেল দেশের বাহির থেকে এই ফোনটা নিয়ে এসেছে। আমি ফোনটা দেখলাম, বর্তমানে বাংলাদেশে এই ফোনটার মার্কেট প্রাইস পয়ত্রিশ হাজার টাকা। যদিও আমার একটা ফোন আছে, গতমাসেই একটা ফোন কিনেছি। চারুদের বাসা থেকে বের হয়ে একটা ফোনের দোকানে যাই। ঠিক করেছি আগের ফোনটা বিক্রি করে দিবো। একসাথে দু'টো ফোনের দরকার নেই। আমার আগের ফোনটা দোকানে দেখালে তারা আঠারো হাজার টাকা দিবে বলে। ফোনটা কেনা ছিলো একুশ হাজার টাকায়। আমি রাজি হয়ে যাই। চারুদের বাসা থেকে পাওয়া ফোনে সব ডকুমেন্ট নিয়ে আমার হাতের ফোনটা আঠারো হাজার টাকাতেই বিক্রি করে দেই। সকালে আমার টিউশন আছে৷ ক্লাস সেভেনের একটা ছেলেকে ইংরেজি আর গনিত পড়াই। এখান থেকে ছয় হাজার টাকা পাই। আন্টির কাছে এই মাসের টাকটা চাইলে পড়ানো শেষে একটা হলুদ খামে টাকাটা দেয়। টিউশন থেকে বের হয়ে আপার বাসাই যাই। মোহনা এখনো ঘুমে। ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলি একটা কাজ আছে আমার সাথে যেতে হবে। রুমানা বলে মামা আমিও যাবো। মোহনা আর রুমানাকে নিয়ে বের হই। আপা বলে, এই দুপুরবেলা তোরা কোথায় যাবি এখন? আপাকে বললাম আসছি একটু পরেই তখন বলবো। আমার কাছে জমানে কিছু টাকা ছিলো। সবমিলিয়ে পঁচিশ হাজার টাকার একটা ফ্রিজ কিনে ভ্যানে তুলি। মোহনার পছন্দ হয়েছে ফ্রিজটা সাথে রংটা বেশি পছন্দ হয়েছে। বাসায় যখন ফ্রিজ নিয়ে আসি আপা অবাক হয়। মোহনা আর রুমানা শুধু হাসে। ফ্রিজ ঠিক করতে দুপুর চলে যায়, মোহনা ফ্রিজে কয়েকটা বোতল পানি রাখে। মোহনা ওর বাবাকে ফোন করে বলেছে, আসার সময় যেনো অনেকগুলো আইসক্রিম কিনে নিয়ে আসে, মামা ফ্রিজ নিয়ে এসেছে বাসায়। নতুন ফ্রিজ আনবার পরেই দুই বোন মিলে বরফ জমিয়েছে, সেই বরফের ঠান্ডা পানি একজন আরেকজনের গায়ে লাগিয়ে দিচ্ছে। মোহনা আর রুমানার বরফ নিয়ে ছোটাছুটি দেখতে ভালো লাগছে। যদিও আপা রাগারাগি করছে তবে দুই বোন আপার কথা না শুনে বরফ হাতের ভিতরে নিয়ে ঘরের ভিতরে ছোটাছুটি করছে। ফ্রিজ নিয়ে ওদের দুই বোনের উচ্ছ্বাস আর আনন্দ দেখে বরফের মতোই শীতল হয়ে যায় বুকের ভিতরটা। আপা যদিও মুখে বলছেন এতো টাকা খরচ করবার কি দরকার ছিলো, তবে আমি বুঝতে পারি আপা খুশি হয়েছেন সেই খুশি প্রকাশ না করলেও চোখেমুখে ছড়িয়ে আছে। একটা ফ্রিজ -মুস্তাকিম বিল্লাহ যারা আইডি ফলো না করে গল্প পরছেন নীল লেখায় চাপ দিয়ে আইডি ফলো করেন 👉👉 Shila F+A SK kawsur