"চেয়ারম্যান


সাব তোর দিকে এইভাবে তাকাইলো ক্যান?"


ভড়কায় কুসুম। আমতা আমতা করতে লাগলো।


"আমি কেমনে কমু!"


"বাপের বয়সী লোক অথচ তোর দিকে কেমন কইরা যেন তাকায়। শুধু আইজক্যা না যহনি হের মুখোমুখি হই তহনি আমি এইটা লক্ষ্য করি।"


"বাদ দে! আমারে দেহনের এত কী আছে! না রং আর না রূপ! হয়তো কালা বইলা দেখে আরকি!"


আর কিছু বললো না নিতু। পাশ থেকে রিয়া বলল,"চেয়ারম্যান সাব মানুষটা এত্ত ভালা তারপরেও হের বউ ম'ইরা যায়। কাহিনীডা কী ঠিক বুঝবার পারি না!"


কথাগুলো বলতে বলতে স্কুলের দিকে পা বাড়ালো ওরা। প্রায় কিছুটা পথ গিয়ে পিছু ফিরে ওদের দিকে তাকালেন চেয়ারম্যান সাহেব।


"কালা মাইয়াডা কার মতি?"


"এই গেরামের রিশকাওয়ালা করিম মিয়ার মাইয়া।"


"ওহ! বিশ কেজি মিষ্টি নিয়া তার বাড়িতে প্রস্তাব পাঠাও।"


চমকায় মতি।


"ওই কালা মাইয়ারে আপনার মনে ধরছে চেয়ারম্যান সাব?"


"হুম।"


"বিয়া করতে চাইতাছেন?"


"হুম।"


"কী কন চেয়ারম্যান সাব কেমনে কী! আপনি হইলেন সুদর্শন একজন পুরুষ আর এই গেরামের মান্যগন্য একজন ব্যক্তি। শেষমেষ আপনি কি-না রিশকাওয়ালার মাইয়ারে বিয়া করতে চাইতাছেন!"


"রিশকা চালায় বইলা হেয় মানুষ না?"


"তা কই নাই চেয়ারম্যান সাব। কালা মাইয়া আপনার লগে মানাইবো না।"


"আমার কোনো সমস্যা নাই মতি। প্রস্তাব পাঠাও। এরপর করিম মিয়া কী কয় জানাইবা।"


"আইচ্ছা।"


গন্তব্যে পা বাড়ালেন চেয়ারম্যান সাহেব। উনার মাথার উপর ছাতা ধরে রেখেছে মতি।

__


স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলো কুসুম। দেখলো তার বাবা-মা মলিন মুখে বসে রয়েছে ঘরের দাওয়ায়।


"আব্বা কী হইছে? কামে যাও নাই আইজক্যা?"


"গেছিলাম।"


"তোমার মুখ শুকনা দেখাইতাছে ক্যান?"


বইখাতা রেখে বাবার পাশে বসলো। মেয়ের মুখের দিকে মলিন মুখে তাকালেন করিম মিয়া।


"বাপের একটা আবদার রাখবা কুসুম?"


"কী আব্বা?"


"আগে কও তুমি রাখবা!"


"আগে তো শুইনা লই!"


শুকনো ঢোক গিললেন করিম মিয়া।


"তোমার বিয়ার লাইগা প্রস্তাব আইছে।"


"কী কন!"


"চেয়ারম্যান সাব তোমারে পছন্দ করছে!"


বিস্ফোরিত নয়নে তাকায় কুসুম।


"এডি কী কন আব্বা আপনার মাথা ঠিক আছে?"


"রাজি হইয়া যা মা।"


"ম'ইরা গেলেও না। ওই লোকটা তোমার বয়সী।"


কুলসুম বেগম বললেন,"এমন কথা কইতে নাই। পুরুষ মাইষের টাকাই সব। টাকা থাইকলে বয়স কিছু না। টাকা থাইকলে বিলাই ও সিংহ।"


কাঁদতে লাগলো কুসুম।


"তাই বইলা বউমরা লোকের লগে তোমরা আমারে বিয়া দিবা এইটা কেমন কথা আম্মা?"


"আল্লাহর ইচ্ছা হইছে বউ মইরা গেছে এতে চেয়ারম্যান সাবের কী দোষ?"


"এই নিয়া হের ছয়টা বউ মইরা গেল। এবার আমারে করলে আমি মইরা যামু।"


"আবার অলক্ষুণে কথা!"


"কিছুতেই আমি এই বিয়া করতাম না। মানা কইরা দিও। বাপের বয়সী লোকের লজ্জাশরম কী সব কুত্তা খাইয়া ফালাইছে যে নিজের মাইয়ার বয়সী মেয়ের লাইগা বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়! খারাপ মানুষ! নজর খারাপ বইলাই বউ মইরা যায়।"


উঠে পুকুরপাড়ে গিয়ে আমগাছের নিচে বসলো কুসুম। ছিঃ! কীভাবে পারলো নিজের মেয়ের বয়সী একটা মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিতে। ভীষণ কাঁদতে লাগলো কুসুম। ম'রে গেলেও সে এই বিয়ে করবে না। পাশের বাড়ির শিমুল ভাইকে তার অনেক ভালো লাগে। মাঝেমধ্যে শিমুল ভাইও তার দিকে কেমন করে তাকায়। ষোড়শী কুসুমের মনে তখন লাড্ডু ফুটে! কুসুম মাঝেমাঝে ভাবে সে মনে হয় শিমুল ভাইয়ের প্রেমে পড়েছে! কিন্তু গায়ের রঙ নিয়ে সে খুব হতাশ! টুপটুপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো তার কৃষ্ণাভ দুগাল বেয়ে। হঠাৎ তার পাশে এসে বসলেন কুলসুম বেগম। মুখ ফিরিয়ে নিলো কুসুম। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,"কান্দিস না যা জামাকাপড় খোল। ভাত খাইতে আয়।"


"খামু না যাও গা।"


"চেয়ারম্যান সাব অনেক ভালা মানুষ। হের বদনাম আমগো এই গেরাম ক্যান কুঁড়িটা গেরামের মানুষও কইতে পারবো না।"


"তাতে আমার কী?"


"রাজি হইয়া যা। আমি তো আসমান থেইকা পড়ছিলাম প্রস্তাব পাইতেই। আমার মাইয়ার লাইগা কি-না প্রস্তাব পাঠাইছে চেয়ারম্যান সাব! জানোস বিশকেজি মিষ্টি পাঠাইছে!"


"খাওগা যাও।"


"কুসুম রাজি হইয়া যা চেয়ারম্যান সাব অনেক ভালা মানুষ। আর তোর গায়ের রঙ কালা। তোরে বিয়া দিতেও দুনিয়ার যৌতুক লাগবো। হেইখানে চেয়ারম্যান সাব তোরে বিশ ভরি স্বর্ণ গয়না দিয়া বিয়া কইরা নিবো। আর আমগো পরিবারের দায়িত্বও নিবো। পুরা বিয়ের খরচ হেই দিবো কইছে।"


"লোভে পড়ছো তোমরা?"


চুপসে গেলেন কুলসুম বেগম।


"তোমগো এই লোভের লাইগা আমি না লাশ হইয়া ফিরি! অতি লোভে তাতী নষ্ট!"

__


রাতে চেয়ারম্যান সাহেব খেতে বসেছেন বৃদ্ধ মায়ের সঙ্গে। এত বড় রাজবাড়ী অথচ বউ নেই,সন্তান নেই। বিয়ে করার কয়েক বছর পরেই হঠাৎ বউ মরে যায়। করতে করতে এই অব্ধি ছয়টা সুন্দরী কচি মেয়ে বিয়ে করলেন। শেষমেশ এইদিন হঠাৎ চোখ পড়লো কুসুমের দিকে। কেন জানি মনে ধরলো উনার। কুসুমের বিনিময়ে উনি তার পরিবারের দায়িত্ব নিবেন। সোনা-দানা গয়নাগাটির কিংবা কাপড়চোপড়,খাবার-দাবার এবং কি আরাম-আয়েশেরও অভাব হবে না। কী রাজকপাল একটা রিকশাওয়ালার মেয়ের! চেয়ারম্যান সাহেব কিছুক্ষণ পূর্বে মতি থেকে জানতে পারলেন সবাই রাজি থাকলেও নাকি গেন্দা বাচ্চা কুসুম বেঁকে বসেছে।


"এখন কী করবেন চেয়ারম্যান সাব? মাইয়া তো রাজি না!"


বাঁকা হাসলেন তিনি।


"রাজি না?"


"না!"


রহস্যময় হাসলেন।


"বিয়ার ব্যবস্থা করো। রাজি না মানে সে নিজ থেকেই রাজি হবে হাসতে হাসতে।"


"কেমনে কী চেয়ারম্যান সাব?"


নীরব রইলেন তিনি। খাওয়ায় মনোযোগ দিলেন।

__


সারারাত অঝোরে কান্না করতে লাগলো কুসুম। সকালে যে একটু নাস্তা করেছিল আর সারাদিন কিছু খায়নি। তার মা চেষ্টা করলেও লাভ হয়নি। একটু জেদি আছে মেয়েটা। পরের দিন সকালে কিছু না খেয়ে স্কুলের দিকে রওনা দিলো কুসুম। কড়া রোদের উপর দিয়ে হেঁটে যেতেই আচমকা মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিতেই কেউ একজন ধরে ফেললো। নিভু নিভু চোখে তাকায় কুসুম। দেখলো মৃদু হাসি ফুটিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন চেয়ারম্যান সাহেব। চট করে বিস্ফোরিত নয়নে তাকায় কুসুম। সরে যেতে নিতেই পারলো না ধরে রাখলেন তিনি। অপ্রস্তুতবোধ করলো কুসুম।


"ছাড়েন কইতাছি!"


ছাড়লেন না।


"নায়ক হইবার চান?"


মৃদু হাসি ফুটে উঠলো উনার ঠোঁটে।


"ছাড়েন কইতাছি!"


নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো মতি। মানে কী হচ্ছে এইসব? ৪৫ বছর বয়সী চেয়ারম্যান সাহেব কি-না ফিল্মের হিরোর মতো ধরে ফেলেছে মেয়েটাকে!


"রাগতাছো কেন?"


"আপনি আমারে ছুইতাছেন কোন সাহসে?"


"মাথা ঘুইরা তুমি পইড়া যাইতে নিছিলা।"


"তাতে আপনার বাপের কী?"


হতভম্ব হয় মতি। চেঁচিয়ে বলল,"এই মাইয়া মাথা ঠিক আছে তোমার কার লগে কী কও! তোমার সাহস তো কম না! চেয়ারম্যান সাব তোমার সামনে সম্মান দাও।"


"বয়েই গেছে।"


চলে যেতে নিতেই খপ করে হাত ধরে ফেললেন চেয়ারম্যান সাহেব। হতভম্ব হয় কুসুম।


"ছাড়েন কইতাছি!"


"কুসুম তোমার লগে আমার কিছু জরুরি কথা ছিল।"


"আপনার লগে আমার কোনো কথা নাই।"


শান্ত মেজাজ চেয়ারম্যান সাহেবের।


"একটু তো শুনো। তারপর না হয় যা ইচ্ছা কইরো!"


"কিচ্ছু শুনমু না।"


টেনে কাছে নিয়ে আসলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,"এত রাগ দেখাও ক্যান? আমি কি তোমারে খারাপ কিছু বলছি?"


"আপনি আমার আব্বা-আম্মার কাছে কী করছেন?"


"তোমারে আমার ভালা লাগছে এটা কি দোষের কিছু?"


"আপনার বয়স দেখছেন আর আমার বয়স দেখছেন?"


"বয়স দিয়ে কী করবা মনের মিলই আসল।"


"ছাড়েন আমারে!"


"একটু শোনো,রাগ কইরো না রাজি হইয়া যাও। তোমারে আমার ভালা লাগছে তাই প্রস্তাব পাঠাইছি অন্যায় কিছু করি নাই।"


"চিনি বাবা সাজতে চান?"


"ছিঃ ছিঃ এইসব কেমন কথা!"


"ছাড়েন কইতাছি!"


চিবুক তুলে ধরলো। চোখে চোখ রাখলেন।


"দয়া কইরা রাজি হইয়া যাও না কুসুমকলি!"


চমকে তাকায় কুসুম। চেয়ারম্যান সাহেবের চোখে কেমন অসহায়ত্ব।

আরও দেখুন 

.

..