-(১৭-খ)

___


________________


শপিং থেকে বের হতেই চক্ষুচড়কগাছ! দেখলো অনিক আর বুশরা শপিংয়ে ঢুকছে! তাদেরকে ফলো করে ইন্ডিয়া আসার মানে ঠিক কী হতে পারে বুঝতে পারলো না ধূসর। চমকে তাকিয়ে রইলো ওরা।


"এই তুই গুলিস্তানের আম্বানি না! এখানে কী? আমাদেরকে ফলো করে চলে এসেছিস তাই না?"


"হ্লা তুই গাউছিয়ার স্যান্ডেল ব্যাপারি না? তুই জিগানের কোন হ্লারে?"


দাঁতে দাঁত চাপলো ধূসর। বাঁকা হাসলো অনিক।


"কুকুর খুশি হলে লেজ নাড়ে। আর গুলিস্তানের কিছু হকার খুশিতে পায়ের উপর পা বসায়।"


"হকার কারে কস হ্লা?"



"তোদের মতো কিছু রাজনীতিখোরকে বলেছি!"


"মুখে লাগাম টান গাউছিয়ার স্যান্ডেল ব্যাপারি!"


"আমাদেরকে ফলো করে কেন এলি?"


"ইন্ডিয়া কি তোর আব্বা অর্থাৎ আমার শ্বশুর আব্বার নাকি?"


তেড়েফুঁড়ে যেতেই টেনে ধরলো দ্যুতি।


"কী শুরু করলে তোমারা! এটা কি নিজের দেশ পেয়েছে নাকি!"


"শালা ছ্যাঁছড়া!"


"তোর বোনের হবু জামাই।"


টেনে নিয়ে গেল ধূসরকে।

___


সানডে। ভার্সিটি অফ। শপিংয়ে গিয়ে একটি ক্যানভাস সহ ড্রয়িং করার সকল সামগ্রী নিয়ে এলো ধ্রুব। অবশ্য সে ড্রয়িং পারে না কিন্তু কেন জানি ভীষণ ইচ্ছে করছে! বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নিলো তারপর ক্যানভাস,পেইন্টিং কালার এবং ব্রাশ নিয়ে একটি টুলের উপর ব্যালকনিতে বসলো। সেদিন রাতে যে পেইন্টিংটা সে স্বপ্নে দেখেছিল সেটা আকার চেষ্টা করলো। জানে পারবে না তবুও ড্রয়িং করার চেষ্টা করলো। তার বিশ্বাস প্র্যাকটিস করতে করতে নিশ্চয়ই একদিন পারবে। এলোমেলো আঁকার করলো। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো। উঠে গিয়ে পীপহোল দিয়ে দেখতেই চমকায়। দেখলো নীলি দাঁড়িয়ে রয়েছে। মেজাজ খারাপ হলো ধ্রুবর। মানে কি এই মেয়েটার সঙ্গে সে কথাই বলে না তবুও তার বাসায় উঠে এলো কেন? খুবই বিরক্তবোধ করছে ধ্রুব। ফের চার-পাঁচবার বেজে উঠলো। বাধ্য হয়ে এবার ডোর খুললো। মৃদু হেসে নীলি বলল,"হাই!"


চোয়াল শক্ত ধ্রুবর।


"কী চাই?"


"একচুয়ালি আমরা তো ক্লাসমেট।"


"তো?"


বিব্রতবোধ করলো নীলি। আমতা আমতা করতে লাগলো। না 


"মানে এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম দেখা করি।"


ধ্রুব জানে নীলি মিথ্যে বলছে!


"কী বলবে বলো?"


"তুমি সুন্দরভাবে কথা বলতে পারো না?"


"না।"


"তুমি খুব হান্ডলি কথা বলো।"


"জানো তো বলো কেন?"


"ভিতরে আসতে বলবে না?"


"আমি একা থাকি ফ্ল্যাট শেয়ার করি না।"


"প্রবলেম নেই একটু দেখি।"


ভিতরে ঢুকতে নিতেই সরে দাঁড়ায় ধ্রুব। চতুর্দিকে তাকালো নীলি।


"খুব সুন্দর! আমি হলে উঠেছি! তুমি চাইলে আমরা দুজন ফ্ল্যাট শেয়ার করে থাকতে পারি। টাকাপয়সা নিয়ে ভেবো না।"


"নো থাংকস।"


"কী করছো?"


"কাজ করছি!"


ব্যালকনিতে গিয়ে বসলো ধ্রুব। পিছু পিছু গেল নীলি।


"তুমি ড্রয়িং পারো?"


"না।"


"তাহলে করছো যে?"


"মন চেয়েছে।"


"কার পিকচার ড্রয়িং করছো?"


"বউয়ের!"


চমকে তাকায় নীলি।


"বউ!"


নীরব রইলো ধ্রুব।


"তোমার বউ আছে?"


"হুম।"


ধক করে উঠলো বুকের ভিতর। কেমন করে কাঁপতে লাগলো।


"কবে বিয়ে করেছো?"


"আট-নয় বছর।"


চমকে তাকায়। আঙ্গুলের কর গুনলো।


"পনেরো বছর বয়সে?"


"হুম।"


শুকনো ঢোক গিললো নীলি। মনটা কেমন জানি করছে! ব্যথা হচ্ছে হৃদয়ে।


"বেবি আছে?"


"বউটাই তো এখনও একটা বেবি।"


"কী বললে?"


"৩টা বাচ্চা আছে।"


চমকে তাকায় নীলি।


"রিয়েলি!"


"হুম।"


রক্তশূণ্য হয়ে গেল নীলির মুখটা। তিন বাচ্চার বাবার প্রেমে পড়েছে সে।


"বিশ্বাস হচ্ছে না।"


"সেটা তোমার ব্যপার।"


নীলির চোখগুলো জলে টইটম্বুর হয়ে গেল বর্ষার ভরা বিলের মতো।


"তুই সত্যি ম্যারিড?"


"কয়বার বললাম?"


"একচুয়ালি আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।"


"তুমি এখন যেতে পারো।"


বিব্রতবোধ করলো নীলি। এত কঠিন কেন মানুষটা?এর নাকি বউ-বাচ্চা আছে! এর বউ একে সহ্য করে কীভাবে?

___


নিশুরা বাংলাদেশ ফিরলো প্রায় পনেরো দিন হলো। আসার পরের দিন জানতে পারলো যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেছে অনিক। কিন্তু যাওয়ার সময় দ্যুতিকে বলে গেল না অনিক কিংবা একটা টেক্সও করলো না। ভীষণ মনখারাপ হয় দ্যুতির। সামান্য পড়াশোনা করে শুয়ে পড়লো দ্যুতি। মনের সাথে তার শরীরটাও কেমন খারাপ করেছে! পড়তে ইচ্ছে করছে না! নিশুকে রেগুলার দু'বেলা থেরাপি এবং তিনবেলা মেডিসিন দেওয়া হচ্ছে। বসে বসে নিশু পড়ছে! একপলক তাকায় দ্যুতির দিকে। বই বন্ধ করে উঠে ব্যালকনিতে গেল। দেখল কেমন ঝড়ো হাওয়া বইছে! বৃষ্টি হবে নাকি! বৃষ্টি ভীষণ পছন্দের নিশু আবার আতঙ্কের নামও। মনে পড়লো তার সুয়াচন্দন,সুন্দরী,গিরিবাজ আর ডিগবাজির কথা। পায়রাগুলোর খোপ ঠিকমতো দিয়েছে কি-না চিন্তা হলো। নুপুরজোড়া পরে আস্তে আস্তে পা ফেলে ছাঁদের দিকে এগিয়ে গেল। ততক্ষণে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো। খোপগুলো ঠিক আছে। ছাঁদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দু-হাত প্রসারিত করে ভিজতে লাগলো। বৃষ্টির শীতল ফোটা মুখে পড়তেই কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি হলো। ভীষণ ভালো লাগছে নিশুর। হঠাৎই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। দু-হাত প্রসারিত করে ঘুরে ঘুরে ভিজতে লাগলো নিশু। প্রায় অনেকক্ষণ ভিজলো। ঝড় বইলো সমানে। দাঁড়িয়ে রইলো নিশু। হঠাৎ বিজলি চমকালো। ভড়কায় নিশু। বেশ কয়েকবার বিজলি চমকে আচমকা কাছে কিনারে কোথাও বাজ পড়তেই চিৎকার দিয়ে উঠে জ্ঞান হারালো নিশু।


পরপর বজ্রপাত হচ্ছে দেখে চিন্তিত হলো সবাই। রিডিং টেবিল থেকে উঠে ব্যালকনিতে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবলো নিশুরা আদেও পড়াশোনা করছে কি-না! ধীরাজকে চেক করলো দেখল সে পড়ছে! নিশুদের রুমের সামনে এসে ভিতরে উঁকি দিলো দেখলো দ্যুতি শুয়ে আছে নিশু নেই আবার দরজাও খোলা। বজ্রপাত হচ্ছে সমানে নিশু কই গেল। ভিতরে ঢুকে দ্যুতিকে ঝাঁকিয়ে বলল,"নিশু কই?"


ঘুমু ঘুমু চোখে তাকায় দ্যুতি।


"দেখো না পড়ছে!"


"কোথায় পড়ছে?"


উঠে বসলো দ্যুতি। দেখলো নিশু নেই। ব্যালকনি চেক করলো দেখলো নেই। ঘাবড়ায় দুজন।


"ওতো রুমে নেই। কোথায় গেল?"


"জানি না!"


বেরিয়ে গেল ধূসর। সারা বাড়ি খুঁজে পেলো না। ভাবলো ছাঁদে দেখবে। মাথামুণ্ডু কিছু নেই মেয়েটার যা ইচ্ছে তাই করছে! ধৈর্যচ্যূত হলো ধূসর। কতক্ষণ মেয়েটাকে চোখে চোখে রাখা যায়?একটু আড়াল হলেই একটা না একটা অকাজ ঘটিয়েই ফেলবে মেয়েটা! ভীষণ বিরক্ত হয়। ছাঁদের দিকে পা বাড়াতেই দেখলো দরজা খোলা। চমকায় ধূসর। দ্রুত ভেতরে পা ফেলতেই দেখলো ছাঁদের মাঝখানে পড়ে আছে নিশু। আঁতকে উঠে ছুটে গেল। ভারী বর্ষণ আর সজোরে বজ্রপাত হচ্ছে। হাঁটু গেঁড়ে বসে মাথা তুলে নিলো কোলে।


"নিশু! এই নিশু! নিশু কী হয়েছে তোর?এই নিশু এখানে কীভাবে এলি? কখন এলি?"


সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।


"নিশু উঠ! কথা বল! নিশু!"


অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর চোখ মেলে তাকালো নিশু।


"নিশু কী হয়েছে তোর?এখানে কখন এলি? কী হয়েছে বল?"


চোখ বুজলো নিশু। আকস্মিক চোখের সামনে ভেসে উঠলো আজ থেকে আট বছরের আগের ঘটনা। তার বাবার অত্যাচার,এরপর হঠাৎ বিয়ে করে বউ নিয়ে আসা,তাদের মা-মেয়েকে মাত্রাতিরিক্ত প্রহার করা,এরপর মামার বাড়িতে ঠাঁই হওয়া,মামা-মামী এবং মামাতো ভাই-বোনদের অত্যাচার,হঠাৎ মায়ের বিয়ে হয়ে যাওয়া,বিয়ের পর যোগাযোগ না করা,হঠাৎই তার মায়ের নিখোঁজ,নিরুদ্দেশ হওয়া,এরপর সৎমায়ের সংসারের আবারও ঠাঁই হওয়া,নিত্যদিন সৎ মায়ের অত্যাচার,শেষ একদিন তাকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা চেষ্টা করা,হঠাৎই মাইন্ড স্ট্রোক করা,তারপর হঠাৎ বিয়ে,এরপর ঠাঁই হয় ফুপির বাড়ি,সেখানে সুফিয়া বেগমের মানসিক টর্চার,ধ্রুবর মারধর! আচমকা চেঁচিয়ে উঠলো।


"কী হয়েছে নিশু বল?"


"আমার মাকে আমি একবার দেখতে চাই!"


চমকে তাকায় ধূসর।


"আমার মায়ের খোঁজ এনে দাও!"


মলিন মুখে তাকায় ধূসর।


"মৃত্যুর পরেও আমার আক্ষেপ থেকে যাবে আমার মাকে একপলক দেখার। শুধু একবার দেখতে চাই! জানতে চাই আমার মা কেমন আছে! আমার মাকে কেউ বিক্রি করে দেয়নি তো! আমার মাকে কেউ ষড়যন্ত্র করে মে'রে ফেলেনি তো!"


ধূসর বুঝতে পারলো নিশুর মোমোরি রিকভার করেছে।


"নিশু থাম!"


অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকায় নিশু।


"একজীবনে আমার আক্ষেপ মাকে একবার দেখা আর কিচ্ছু না!"


"অবশ্যই চেষ্টা করবো। বাসায় চল ঠাণ্ডা লাগবে!"


হাত-পা ছেড়ে দিলো নিশু। শরীরটা কেমন কাঁপছে! দাঁতে দাঁত লেগে কেমন ঠকঠক করে কাঁপছে! ভড়কায় ধূসর। উঠিয়ে বসাতেই পড়ে যেতে নিতেই ধরে ফেললো। বিকট শব্দে আচমকা বজ্রপাত হতেই ভড়কায় দু'জন। চট করে পাঁজাকোলে তুলে নিচে নামতে লাগলো। টুপটুপ করে নুপুর থেকে বৃষ্টির পানি পড়তে লাগলো।

___


চলবে~